Struggle part 3

 আমি চুপচাপ দাড়িয়ে দেখতে লাগলাম মানুষের চরম অসহায়ত্ব।এখানে দরিদ্রতম শ্রেণীর মানুষের আগমন সবচেয়ে বেশি।যাদের টাকা পয়সার সমস্যা ,তারাই এসে এখানে প্রতি পদে পদে যুদ্ধ করে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ নেই।আমি এক হাতে রুমাল,আরেক হাতে ব্যাগ নিয়া দাড়িয়ে আছি। হাঁচির উপর হাঁচি হচ্ছে।আমি রুমাল দিয়ে নাক পরিষ্কার করে শেষ করতে পারছি না।

3 টা রুমাল পুরু ভিজে শেষ,এখন তো পুনরায় ওই রুমাল না ধুয়া পর্যন্ত ব্যাবহার করা যায় না।কারণ আমি প্রায় 4 ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম।হসপিটালের গেটে ফেরিওয়ালারা রুমাল বিক্রি করেন।সেখান থেকে আমি আরো 3 টা রুমাল কিনে নিয়া আসলাম।একজন মহিলাকে বলে গিয়েছিলাম,যে আমার জায়গাটা একটু দেখবেন দয়া করে।আমি শুধু রুমাল কিনেই চলে আসবো।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি,উনি আমার জায়গা ধরে রাখেন নি।আমি যখন এসে সেখানে দাড়াতে যায়,পিছন থেকে এক ভদ্র মহিলা আমাকে বলে,আপনি এখন এসে এখানে দাড়াতে চাচ্ছেন কেন? পিছে যান,সবার পিছনে।

আমি বললাম,আমি এখানেই দাড়িয়েছিলাম, শুধু একটা রুমাল কিনতে গিয়েছিলাম।উনি বললেন না আমার সামনে আপনাকে দাড়াতে দিবনা।আপনি পিছনে যান।

অসহায়ের মত পিছে গিয়ে দাড়ালাম।

আব্বা এসে বলতেছে,আগে আসনি? আমি বললাম আগেই এসেছিলাম আব্বা,আমি রুমাল কিনতে গিয়েছিলাম একটু আগে,জায়গাটা আর পেলাম না।আমাকে দাড়াতেই দিচ্ছে না আমার জায়গায়।

লোক আর লোক।অনেক চাপাচাপি করতেছে মানুষ।

আহা সংগ্রাম!

যায় হউক টিকেট কাউন্টারে লোক এসেছেন।টিকেট দেওয়া শুরু।আব্বা গিয়ে ছেলেদের লাইন এ দাড়িয়েছেন? আমি পিছনে,অনেক সময় লাগবে,টিকেট নিতেই। ডাক্তার ততক্ষণ থাকবে কিনা ।নিশ্চিত না।তাই আব্বা ছেলেদের ওখানে দাড়িয়েছে।ছেলেদের ওখানে ২০০ লোক হবে সর্বোচ্চ। পরে আব্বা আমার সিরিয়াল নিতে পেরেছেন।অনেক কিছু দেখলাম,এখানে একজন ভদ্রলোক এসেছেন,মাত্রই আসলেন, আর টিকেট নেওয়াও শেষ।ভাবলাম,উনারা বড়লোক।উনাদের লোক আছে,তাই আগে টিকেট নিতে পেরেছেন।এখানে অনেক কিছুই দেখেছি। নেপোটিজম বলে একটা শব্দ আছে।যায় প্রয়োগ আমি এখানে দেখেছি।এখানে কেউ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেও তাকে একটু আগে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করবে না।আবার যাদের লোক আছে,তারা আসবে আর যাবে।আমার মত গরীব সাধারণ মানুষের মতো ভোর 7 টাই এসে সিরিয়াল আর জন্য দাড়িয়ে থাকতে হয়না।আব্বা সিরিয়াল নিয়া আমাকে বললেন,,চলে আসো।আমি তুমার টিকেট নিয়েছি।এবার আসল ডাক্তার এর কাছে যাওয়ার পালা।সেখানেও গিয়ে দেখি,মিনিমাম 100 জনের পিছে আমি।

আব্বা বললেন,,এত রুগী কি আজকে দেখবে? তবুও আশা নিয়া দাড়িয়ে থাকলাম।আমি অনেক কিছুই তখন বুজি না।কিন্তু সেদিনের অভিজ্ঞতায় আমি অসহায়ত্বের সংজ্ঞাটা শিখে গিয়েছিলাম।কিছু কিছু মহিলা কথা কাটাকাটি শুরু করে দেন,মাঝে মাঝে।আমি দু একবার যে কান্না করা শুরু করে দিয়েছিলাম,,সেটা বাবাকে বুঝতে দেইনি।আব্বা আবার মন খারাপ করবে।অনেক সাধনার পর  দুপুর আড়াইটা বাজে,তখন আমি ডাক্তার এর কাছে গেলাম। ডাক্তার এর নাম আমার মনে আছে,নুরুল ইসলাম। 

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।তিনি আমাকে শুধু জিজ্ঞেস করলেন,কি হয়েছে ? আমি বললাম ঠান্ডা লেগেছে।

উনি আর কিছুই বললেন না।একটা ট্যাবলেট লিখে দিলেন।কিছু গ্যাসের ওষুধ দিলেন সাথে।যা হসপিটাল দিবে।আব্বা বাইরে এসে,ওষুধ টা নিলেন।সেখানেও সিরিয়াল।আহা সেদিনের জার্নি আমার আজীবন মনে থাকবে।আব্বা বললেন, ডাক্তার তো তেমন কিছুই শুনলেন না। শুধু কি হয়েছে সেটাই বললেন।

1 মিনিট সময় ও দিলেন না।আব্বা বললেন,ওষুধ খেয়ে দেখ এইটা,কি হয়।আল্লাহ ভরসা।আমি ম্যাস এ এসে অনেকক্ষণ কান্না করেছি।আমার বাবার দুর্বলতা আমি সেদিন দেখেছি।টাকার অভাবে বাবা আমায় সেদিন ওই সরকারি হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল।আমি শুধু পরে বুজেছি।আমার কষ্ট হয়না,আমার বাবা গরীব বলে।কষ্ট হয় তখন,যখন দেখি চেষ্টার কমতি থাকেনা তাদের নিজের সন্তানদের ভালো রাখার।আমি ওই ওষুধ খেলাম 2 সপ্তাহ।আমার বিন্দু মাত্র ঠান্ডা কমে নাই।বাড়িতে বললাম,আম্মা বললেন,কালো জিরা,রসুন,মধু পাঠিয়ে দিচ্ছি তুমার বাবার কাছে।এইসব খেলে ঠান্ডার 14 গুষ্টি নাকি শেষ হয়ে যায়।আমিও খেলাম।প্রতিদিন রাতে রসুন আর মধু একসাথে খেয়ে নেই।দিন 3 বেলা খাবার এর সাথে কালোজিরা ভর্তা খাই।এভাবে চলে অনেক দিন।কিন্তু কোনো উন্নতি নেই।আমার সামনে অর্ধবার্ষিক এক্সাম।একটু পড়তে পারি না।হায়রে হাঁচি।

আমার জীবন যায় যায় অবস্থা,হাঁচির জন্য।



Comments

Popular Posts