বিচ্ছেদ

 গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছি।অনেক দিন পর বাড়ি যাওয়া।বিকেলে বসে আছি রুমে..

কমলার মা এসেছে আমাদের বাড়িতে। পাশের বাড়িতে থাকে।উনার জামাই দিনমজুর।কখনো কাজে যায়,আবার কখনো কাজে যায়না

আর শুধু শুধু হুকুম জারি করে।বাজার করার তো মুরোদ নেই।খাবার ভালো লাগছে না,খাবার রান্না করতে পারিস না ভালো করে।লবণ বেশি হয়েছে। ভাত ফুটেনি।

আছে না কিছু?

ভাত দেওয়ার ভাতার নেই,কিল দেওয়ার ভাতার।তো উনার ক্ষেত্রে উনার জামাই এর দায়িত্বটা সেরকমই।

অভাব এর যন্ত্রণায় ধুয়া উড়ে উনার পরিবারে।তবুও এই লোকের ইনকাম এ কোনো চাহিদা নেই।

সংসারে কলহ লেগেই আছে।এমন কোনো দিন নাই 

কমলার মা জমিলা বেগম স্বামীর থেকে মার না খাই!

3 মেয়ে আর 2 ছেলে।সাত জনের পরিবার।বড়ো মেয়ের নাম কমলা।

আমার আম্মাকে ডেকে বলতেছেন

বুজান।

ও বুজান?

মা নামাজ পড়তেছে আসরের।তাই আমি উনার ডাকে সারা দিলাম।আপনি একটু বসুন,আম্মা নামাজে আছেন।

শেষ হলেই কথা বলতে পারবেন।

কি যে বলো, মাওডা না আমার।

আমার এডা কথা হুনবে?

জ্বী বলেন।

তুমার কাকাই বাইদা।কাজ কাম করেনা।

গরে বাজার নাই।পোলাপান নিয়ে রাতে উপাস থাহন লাগবো।তুমার আম্মার কাছে আইছি,কিছু খুত কর্য নিতে।

আর তুমাগো ওই বাগান থেকে কয়ডা এলানচি শাক

নিমু। রাতে শাকের জাও পাক করে কোনো রকম রাত টা পার করবো।আমাদের বাড়ির পাশে একটা সবজি বাগান আছে।সেখানে সব ধরনের সবজি চাষ হয়।

বলি কি তুমি দেখো না।দিতে পারো কিনা?

আমি যদি আবার 2 মিনিট বাড়ি ছাড়া থাহি,

মাগো কিযে মাইর দিবো।

এর কোনো বাপ মা নাই।

এই দেহ,কালকেও মারছে।

জামিলা বেগম নিজের পীঠ আর হাত বের করে দেখালেন আমাকে।

সম্ভবত লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে উনাকে।

আমার কলিজা কেপে উঠলো।জীবন কত কঠিন।

মা ততক্ষণে নামাজ শেষ করে ফেলেছে।

জমিলা বেগম খুঁত আর শাক নিয়ে বাড়িতে গেলেন।

সকালে আমি ব্রাশ করতেছি আর হাটতেছি একটু রাস্তা দিয়ে।আমাদের বাড়ির সাথেই রাস্তা।

হঠাৎ করেই, চিল্লা চিল্লি শুরু।আমি ভাবলাম,এত সকালে কে এমন করতেছে।তাই একটু এগুতে থাকলাম।

দেখি,জমিলা বেগম। দৌড়ে দৌড়ে কোথায় যেনো পালাচ্ছে।পরক্ষণেই পিছে পিছে তার স্বামীকে দেখলাম।

তিনিও দা হাতে তাকে মারবে বলে এগুচ্ছেন।একজন জীবন কে নিরাপদে রাখতে দৌড়াচ্ছে ।আরেকজন দৌড়াচ্ছেন তার পুরুষত্ব প্রকাশ করতে।

আমি না এই বিষয়টি দেখে একটুও বিচলিত না।

কারণ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ হতো দরিদ্র।তাদের জীবনে অভাব এর সাথে লেগে থাকে নিত্য কলহ।

জমিলা বেগম সেদিন এক দুপুর পালিয়ে ছিলেন।আমি ঘরে বসে আছি। আম্মু বলতেছে,তুমার বাবা তুমার জন্য জাম কিনে নিয়ে এসেছে।ভর্তা করেছি।খেয়ে যাও।আমার অনেক প্রিয় ফল জাম।

আমাদের জাম গাছ নেই।নানু বাড়িতে গাছ আছে,মামা মামী প্রতি বছর আমার জন্য দিয়ে যায়।তবে আব্বুর মাথায় থেকেই যায় বিষয়টি যে আমি খুবি পছন্দ করি জাম।তাই বাজারে গেলে,জাম দেখলেই হয়তো আব্বার মনে পড়ে আমার কথা। কিনতেও আর দেরি করেন না।

আমি গেলাম খাবার রুমে।দেখি জমিলা বেগম মুখে অচল গুঁজে কান্না করতেছে আর আম্মাকে বলতেছে,আমার বাচ্চা গুলো না খেয়ে আছে।আমাকে 1 কেজি চাল দিন। আমি  বিক্রমের আম্মাকে একটা কাথা সেলাই করে দিয়েছি।সেটার টাকা পামু পশু দিন।বুঝান আমি তহন টাকা দিয়ে যাবো।আপনি আমাকে একটু দেখেন।

একজন মা,যিনি এখনো বাসায় যেতে পারছেন না।স্বামীর ভয়ে।নিজের সমস্যায় জর্জরিত।তবুও তিনি তার সন্তানের কথা মাথায় রেখেছেন।তিনি খাবেন কি খাবেন না,সেটা বিষয় না।তার বাসায় যাওয়া হবে কি হইবে না,সেটার ঠিক নেই।

তিনি এটাও জানেন,বাসায় গেলে স্বামীর হাতে তাকে মারের ভাগ টা নিতেই হবে।তবুও নিজের সন্তান,না খেয়ে থাকবে।সেই চিন্তায় তিনি অস্থির।এই মনে হয় মা।

আমি ভাবলাম,কি অদ্ভুত এই দুনিয়া।আমার বাবা যিনি বাজারে গিয়ে সন্তানের পছন্দের ফল নিয়ে আসতে ভুলেনা।অন্যদিকে জমিলা বেগমের স্বামী নিজের সন্তানের কথা ভাবতে ও চাই না।

উল্টা নিজের স্ত্রীর উপর জুলুম করে।

এটা পুরুষের ধর্মে পরে না।

পুরুষ তো সেই,যে নিজেকে দায়িত্বের মাঝে বিভুর রাখবে।এতটা বিভূর যে,নিজে খেয়েছে কিনা,সেটাই মাথায় থাকবে না।

পুরুষ তো সেই,খা খা মধ্য দুপুরেও যার তৃষ্ণার কথা মনে হবে না।

মনে হবে,তার মধ্য দুপুরের প্রতিটা সেকেন্ডের কর্মের  ফলাফল হবে,তার ফ্যামিলির ভালো থাকা।

পুরুষ তো সেই,যে স্ত্রীর সম্মান আর সন্তানের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে অকপটে।

পুরুষ মানেই, তেজস্বী। পরিবারের সুখে নিজেকে শেষ করে দিতে  দু বার ভাববে না।কিন্তু কেউ তার পরিবারে হাত দিলে,তাকে শেষ করে দিতে তার এক মুহূর্তও ভাবতে হবে না।

অথচ আমার বাবা আর জমিলার স্বামীর মাঝে রাত দিন তফাৎ।যেখানে জমিলার স্বামীর সুস্থ দেহ,বুধ বুদ্ধি সবই আছে।তবুও তার স্ত্রী,সন্তান কত কষ্ট করে।

এই বৈশিষ্ট্য যুক্ত পুরুষ মানুষ গুলো আসলে,পুরুষ জাতির ক্যান্সার।কথা গুলো ভাবছিলাম আর

আমি জাম ভর্তা খাচ্ছি। আম্মু আর জমিলা বেগম ও খাচ্ছে।

তরকারি কি করবা?আমার আম্মু জিজ্ঞেস করলেন।

বললো, কচুপাতা ভর্তা করমু।

আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম।আপনি তো অনেক কষ্ট করে এই সংসারে আছেন।তো আপনাকে সকালে কেনো মেরেছিল?

বিষয়টি কি ছিল?

মাগো,বলনা আর।

সকালে উঠেই বলেছি, শুনো না।ঘরে তো কিছুই নেই।বাচ্চা গুলো কি খাবে। যাওনা আজকে একটু কাজে আজকে।

কয়েকদিন তো বসে থাকলেই।

আজকে যাও। সুরুজ ভাই.

পাশের বাড়ি থাকে। চিন না তুমি?

না চিনি না।

তুমার কাকা হয় ।

তো ভাইজান আসছিল।উনাদের কিছু ধান কাটবে।

আমাকে বলে গেছে যে,কমলার বাপকে পাঠায় দিও।

অনেক গুলো কামলা নিয়েছি,সুরুজও আসুক।

আমি বলেছি ভাইজান,আমি আপনার ভাইকে বলে পাঠিয়ে দিবো।

এই জন্যই ওরে বলেছি,যে সুরুজ ভাই যেতে বলেছে।কাজ দিবে উনার মাঠে।তো যাও তাহলে।


কিছু টাকা তো আসবে।তবুও চাল ডাল কিনে দু মুঠ ভাত তো খেতে পারবো।এক্কেবারে ঘর ফাঁকা।

না আছে চাল,না আছে তেল,নুন।

না আছে তরকারি।

অন্যের থেকে ধার কর্জ করে আর কত চলবো!


এই বলতে না বলতেই সে আমাকে বলতেছে।

আমাকে দেখছে এখন। বসে থাকতে।ঘুম থেকে উঠেই কোনো কথা নেই বার্তা নেই।শুরু করেছে কান পরা


দুদিন ও বয়ে থাকতে পারিনা। চোখের বালি আমি।

তোর পুলাপান তুই ভিক্ষা করে নিয়ে এসে খাওয়া।আমি এক পয়সাও কামাই করবনা।

তুই অন্যের বাড়িতে কাম করতে যাইতে পারিস না।

আমাকে বলিস।

বসে থেকে তো এপাড়া ও পারা ঘুরে আসিস টইটই করে।

আমার বুজি জীবন নাই।আমি কি বলদ।তোরে যে কত কইলাম,তোর বাপের বাড়ির অংশ নিয়ে আই।

ওইটা শুনিস না।আমাকে কাজে যাওয়ার কথা বলতে তো ভুলিস না।আমি তোরে আর তোর গেদা গেদিকে খাওয়াইতে পারমু না।

তুই ঢাকা যা গা আমার তোরে লাগবোনা।

আচ্ছা মা একটু ভাবতো?

আমার তো আব্বা আম্মা নাই।আমার এডা ভাই।টাও পঙ্গু।আমি ওর থেকে ওর পেটে লাথি দিয়ে কেমনে অংশ নিয়ে আহি ।ওর কোনো আক্কেল বুদ্ধি নাই।

আমি মনে মনে ভাবলাম,আক্কেল বুদ্ধি থাকলে আবার নিজের পরিবারের না খেয়ে থাকা সহ্য করতে পারে নাকি!


ওর শুধু শুধু ফাঁকিবাজি করে চলবে।আর আমাকে ঘুরে ফিরে ওই এক কথায় বলতে বলে।

আমার ভাই, রহুল।ওর কত কষ্ট।ছোট ছোট ছেলে মেয়ে।আমার 10 বছরের ভাইপো পিন্টু। ও এখনি কাজ করে।কি করবে বাবা অসুস্থ।আর আমার ভাইয়ের বউ সারাদিন সেলাই করে।5 জনের পরিবার।

আমি মইরা যাইতে পারি,আমার ছুট ভাইটার পেটে লাথি দিবার পারমু না।

ও আমাকে কই থেকে টাকা দিবো।

বাচ্চা কাচ্চা গুলো বড়ো হলে,তখন তাও একটু বলা যাবে।

এইটাই আমি বুঝাতে পারিনা।

তাহলে আপনি এই সংসারে পরে আছেন কেনো?

চলে যাওয়াই ভালো।

বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কাজে নেমে পড়েন।

খেয়ে পড়ে অন্তত চলতে পারবেন।

নিয়ম করে তিন বেলা মার খেতে হবে না অন্তত।

কিযে কও না ।

মাইয়া মানুষের জামাই হইলো। মাতার ছায়া।

হেরে আমি রাইখা যাইবো কেমনে?

কি খাবে কি খাবে না।

আমি একবার মনে মনে বললাম,মহিলা এইটা পাগল নাকি। 

নিয়ম করে খাবার খাই মানুষ।

আর উনি খান মারধর।

হে নাকি আবার জামাই এর কথা চিন্তা করে।

আমি একটু বিরক্তই হলাম।


নিজে বাঁচে না।সেটা কিছু না।জামাই এর ভুত যায়না মাথা থেকে।উনার কথা শুনে মনে হলো,জামাই শব্দটা যেমন মূল্যবান। তেমনি উনার থেকে লাঞ্ছনা পাওয়াটাও মূল্যবান।

আমি জানি না আসলে সংসার কেমন হওয়া উচিৎ।বা হয় কেমন।

অনেক মহিলা আছে,যারা সংসারে বিন্দু মাত্র শান্তি পাইনা।স্বামীর থেকে শত অপমান নিতে পারে।

প্রয়োজনে মরে যাতেও রাজি,কিন্তু সংসার ছাড়তে রাজিনা।

এদের মধ্যে এই জমিলা বেগম একজন।



দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেও তিনি যাবেন না।

খাবার না দিলেও তিনি ছেড়ে যাবেন না।


উনার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম।

দুনিয়া উল্টে গেলেও উনি উনার সংসার ছেড়ে কোথাও যাবেন না।

উনি চলে গেলেন,

আম্মা হাসতেছে আর আমাকে বলতেছে।

তুমি কাকে কি বুঝাও ।

একদিন ওর জামাইয়ের জর আসছে।

দৌড়ে আসছে তুমার আব্বার কাছে।

ভাইজান,আমাকে কিছু টাকা ধার দিনতো।

আমি আপনার বাড়ি কাজ করে হলেও শুধ করে দিবো।

নিয়ে গিয়ে জামাইকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুললো।

সুস্থ হয়ে উঠেই বলে কি শুনছো?

কি বলে আম্মা?

কই তোর নাকি টাকা নাই!

আমাকে শুধু শুধু অন্যের বাড়ীতে কাজে পাঠায় দিস।

এখন কোথায় টাকা পেলি।

বাজার করি না।বাজার নাই বাজার নাই বলে আমার কান জালা ফেলা করে ফেলিস।

টাকা জমিয়ে রেখে আমাকে শুধু শুধু কামে পাঠানো।

আমি কথা গুলো শুনে কি পরিমান যে হেসেছি।

যায় হউক...


সংসারে অভাব অনটন আর না খেয়ে দিন কাটানো জমিলার পরিবারে নিত্য কাজ।

তবুও সংসার ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা মাথায় বিন্দু মাত্র আসেনা।

দিনে একবেলা খাবার পেলো কি পেলনা,সেটার কোনো ঠিক নেই।

কিন্তু নিয়ম করে 3 বেলা মার খাওয়া আর লাঞ্ছনা জমিলার নিয়মিত কাজ।

তবুও জামাই সংসার নিয়ে সে আশাবাদী।

পরনে কাপড় ছেড়া, পেটে ক্ষুদা 

এই সব কিছুর সাথে যোদ্ধ করেও জমিলার মুখে হাসি থাকে।

সব সময় বলে আল্লাহ ভালো রাখছেন।

আমার কোনো অভিযোগ নাই।

যা আছি আলহামদুলিল্লাহ....

জীবনে কিছু কিছু বিষয়,যেটা আমাদের হাতে থাকে না।কিন্তু সেটা মেনে নেওয়াটা আমাদের হাতেই থাকে।




হাজার মারধর এ শিকার হলেও সে তার জায়গা ভুলে যায়নি। সে ভুলে যায়নি,সে যেমন একজনের স্ত্রী,তেমনি সে এখন পাঁচ সন্তানের মা।তাদের ভালোর জন্য হলেও নিজের ভালোকে তুচ্ছ করে দেখতে হবেই।



আমি দেখেছি, জমিলার মত হাজার মেয়ে আছে যারা শত কষ্ট করেও জীবনের উপর কোনো আক্ষেপ নেই।

আর বর্তমান সমাজে শুধু মাত্র মেন্টালিটি ম্যাচ করছে না বলেই,ডিভোর্স পেপার এ সাইন করতে এক সেকেন্ড সময় লাগে না।

অন্যের মেন্টালির সাথে নিজের মেন্টালিটি ম্যাচ করার চিন্তা করতে গিয়ে,নিজেকে যে মেন্টালিটি হীন বানিয়ে ফেলছে।সেটাই বর্তমান সমাজের শিক্ষিত,সচেতন মানুষ বুঝতেছে না।

সেই জমিলার মত হলে যে কি হতো,,,

আল্লায় জানে।

বাচ্চা রেখে হাজার হাজার দম্পতি আলাদা হয়ে যাচ্ছে।।


সব কিছুর বিকল্প হয়তো আছে,

সন্তানের কাছে বাবা মার বিকল্প কিছু নেই।

এইটা আমাদের গুড মেন্টালিটির মানুষ গুলোর মনে রাখা উচিৎ।


























Comments

Popular Posts