নিয়তি
হঠাৎ পাশের বাসায় চিল্লাচিল্লি।রাত তখন দশটা।আশেপাশের সব মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে প্রায়।গ্রামের একটা পাখিও জেগে নেই।প্রকৃতি যখন একেবারেই নিস্তব্দ তখনই বেজে উঠে এক বিদায় বেদনার সুর।
ঘুম থেকে উঠে পাশের বাসায় মানুষ যাচ্ছে দৌড়ে।
মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সংবাদ আসিফ এর বাবা যে আর পৃথিবীতে নেই। গ্রামের কোনো কিছুই এক লহমায় বিস্তার লাভ করে।এখানে এমন না শহরের দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে খবর পৌঁছে দিয়ে আসতে হয়।শহরের কারোর বাসার নিচে লাশ পরে থাকলেও ওই বাড়িওয়ালা জানে না।বলতে পারেও যদি হয়তো,কিন্তু ওইটা যে একটা লাশ,মানুষের লাশ সেই রকম দুঃখের আবির্ভাব তাদের মনে উদয় হয়না।গ্রামে ঠিক তার উল্টো।
আসিফ ছেলেটার বয়স ১০ বছর।ক্লাস ফোর এ পড়াশুনা করছে এইবার।বাবা মায়ের একটা ছেলেই ও।
তার বাবার প্রথম বিবাহিত জীবনের একটা মেয়ে আছে।
মেয়েটার নাম,আখি।হয়তো ভালোবেসেই মা বাবা নাম রেখেছিল আখি।বাবার নাকি নয়নের মণি হয় মেয়েরা। তাই হয়তো এমন টা নাম দেওয়া হয়েছিল।
সময় অনেক কিছুর নাম পরিবর্তন করে দেই।
মেয়েটার বয়স যখন ১২ কি ১৩ তখনই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হলে মেয়েকে আর বেশি দিন ঘরে রাখা সম্ভব হয়নি হেল্পলস বাবার পক্ষে ।
যে যুগে মেয়ের জীবনের থেকে বাবার আবার আবার নতুন করে জীবন শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়,সেই যুগে মেয়েদের জীবনে সুখ,শান্তি আসবে।এইটা আশা করাই গাধামো। অথবা মেয়েরা নিরাপদ তার বাবার ঘরে এইটাও ভাবা মিথ্যে স্বপ্ন মাত্র।
বাবারাই নাকি মেয়েদের সুখ কেনার সবচেয়ে বড় ক্রেতা।কিন্তু এখানে ঠিক উল্টো মনে হয়।আখি, যার বাবা তার মাকে ডিভোর্স দেই।পরে আবার নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আরো একটা বিয়ে করে।আখির মাকে কেনো ডিভোর্স দেওয়া হয়েছিল,তার কারণ হিসেবে জানা যায়। মঈন মিয়ে আয় রোজগার করতো না।সংসারে নিত্য নতুন জামেলা থেকেই যেতো।শেষমেষ কোনো একটা দিন জামেলা চলাকালীন সময়ে চেলেদের দেওয়া বিখ্যাত তিনটি পাওয়ারফুল শব্দের ভুল প্রয়োগ করে ফেলেন।
যেটাকে আমাদের ইসলাম ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদ বলে। ক্ষমতা দিয়েছে,তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে না। তানা না হলে বেটা মানুষ কিসের আবার উনারা। নিজের পুরুষত্ব দেখাতে হবে না!
খুব অদ্ভুত একটা বিষয়,ঘরের বৌ যদি জামাই এর আয় রোজগার নিয়ে কথা না বলে, ভালো মন্দ যদি না বলে,আমার প্রশ্ন বাইরের কোনো মেয়ে এসে বলবে নাকি?অথবা বলবে টা কে?
নাকি বলার অধিকারি নেই?
কোনটা আমার মাথায় আসে না বিষয়টি।
আর এইখানে পুরুষত্ব দেখানোর জন্য রাগ করে উল্টো বউয়ের সাথে কথা কাটাকাটি করা কোন ধরনের পুরুষত্ব আমি বুঝিনা।
নিজের জৈবিক চাহিদা মেটাতে অন্য আরেক বাবার মেয়ের জীবন নিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করার চিন্তা চলে আসে মাথায়।
মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিয়ে করার জন্য তখন পাঁচ বছরের মেয়ে আখিকে আপাদত নানা বাড়ি রেখে দেই মঈন মিয়া।একদিকে নিজের মেয়ের জীবন নিয়ে যেমন মঈন মিয়ে ছেলেখেলা করতেছে,ঠিক উল্টো দিকে আরেকটি বাবার নিষ্পাপ মেয়ের জীবন নিয়েও খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কোনো রোজগার করা যদি উনাদের ভালই না লাগে, বৌ এর দেখা শুনা অথবা দায়িত্ব যদি বিরক্ত কর লাগে।আমার মনে হয়না উনাদের মত মানুষের বিয়ে করা উচিৎ।অথবা নিজেকে কোথাও আবদ্ধ করে রাখা উচিত।সন্ন্যাসী হয়ে জীবন যাপন করা বেস্ট।থাকা খাওয়ার চিন্তা থাকবে না।থাকবে না কোনো সাংসারিক জামেলা।
এর থেকে সুখী জীবন অন্য কোনো কিছু হয়না।
তার বৌ রত্না বিবি তার ছেলেকে পাশে নিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে।
তার গল্পটা এমন ..
সংসারের অচল অবস্থার সাথে যোদ্ধ করতে থাকা রহিম মিয়ার চার মেয়ের মধ্য ছোট মেয়ে রত্না।
পর পর চার মেয়ের মুখ দেখার পর উনাকে আল্লাহ ছেলে সন্তান দান করেন। আট ছেলে মেয়ের সংসার। বড় তিন মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।এখন পালা রত্নার।
অভাব,অনটন রহিম মিয়ার নিয়মিত সমস্যা।একজনের আয়ে কি বা হয়।এর পর আবার আজ কাজ করে তো কালকে করে না।যদি উনি এক্টিভ পারসন হতেন,তাহলে শশুরবাড়ি গিয়ে থাকতেন না।রহিম মিয়াও শশুরবাড়ি গিয়ে থাকেন।সে যাই হউক।তিন মেয়ে বিয়ে দিয়ে উনার আর ভালো থাকা কিভাবে সম্ভব।রবীন্দ্রনাথের যুগের সেই পন প্রথা এখনো বাংলার শিরাই শিরায় বাসা বেঁধে আছে। এখান থেকে বাঙালির মুক্তি নেই। কখনোও হবে কিনা জানি না।রহিম মিয়া তিন মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর যত টুকুও বা সংসারে সচ্ছলতা ছিল, সেটাও চলে যায়।তিনি দিনমজুরের কাজ করেন।আত্মীয়, স্বজন সামলানুর বিষয় আছে।সব মিলিয়ে উনি বিপর্যস্ত।
তার চার নম্বর মেয়ের বয়স যখন ১১। তখন আসেন নীলপুরের একটা ঘটক সফু । দমপুর গ্রামের রহিম এর সাথে বাজারে দেখা সাক্ষাৎ হয়।সেই সুবাদে পরিচিতি।
প্রথমে রহিম মিয়া না করেন মেয়ের বিয়ের প্রস্তাবে।
বলেন,মেয়ে ছুট।
প্রাইমারীতে কোনো রকম ডগর মগর করে যায় আসে আর কি রত্না।পড়ালেখার প ও বুজে না সংসারের কোনো ব্যক্তি সেখানে রহিম মিয়ার ছুট মেয়ে রত্নার পড়াশুনার গুরুত্ব বুজবে কে?
বাবা প্রথমে ছুট বললেও, ঘটকের দেখানো লোভ এর কাছে মেয়ের ছোটত্ব নিমিষেই হারিয়ে গেলো।
যেদিন রত্নাকে দেখতে আসলো।সেদিন এক হাফ পেন্ট পরে গাছের নিচে দুল খাচ্ছিল।সাথে তার জেঠা তো বোন রাখি ও খেলছে।সম বয়সী ওরা দুইজনেই।তাই মিলিয়ে নাম রাখা হয়েছে রত্না রাখি।
মঈন আর তার বাবা আসছেন মেয়ে দেখতে। রত্নাকে ঘরের পিছনের দরোজা দিয়ে পিঠা দেওয়ার অজুহাতে ডেকে নিয়ে গেলো তার মা।অন্যদিকে রাখি গাছের নিচে বসে রইলো।কিছুক্ষণ পর রত্না দৌড়ে রাখির কাছে গেলো,রাখি দেখ দেখ আমাকে ওই লোকটা বিস্কিট দিয়েছে। নে ধর আমরা দুইজনে মিলে খাই।
দুজনের বিস্কিট খেতে লাগলো আর খেলতে থাকলো।
বেচারা রত্না জানেও না,তার সাথে কি হতে চলছে।তার জীবনে কতবড় ঝড় আসতে চলছে।কতটা অসহায় হলে একটা বাবা এত ছুট একটা মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সাহস পাই।শুনেছিলাম,গৌরিদান প্রথাই নাকি মেয়েদের পাঁচ এর পর বিয়ে দেওয়া হতো। আট পার হওয়া নাকি অপরাধ ছিল।আজকের এই একুশ শতকে এসে আমরা ১০ কে বলতেই পারি মেয়াদ উত্তীর্ণ।
রত্না দেখতে সুন্দর অনেক সুন্দর ছিল।মাথায় দুইটা ঝুটি করে রাখতো।কখনও গুল জামা পড়ত,নয়তো খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতো।
মঈন সাহেব কে দেখতে তালগাছের মত লম্বা,ঠেংঠেঙ্গা।
গায়ের রং উজ্জ্বল বর্ণের হবে একটু।
রহিম মিয়ে ছেলেকে দেখে পছন্দ হলো।বিয়ে দিবেন এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।একটুও ভাবলেন না আমার এই মেয়েটা এই লোকের দিকে তাকাবে কিভাবে?
তাল গাছে তাকানোর মত উকি দিতে হবে। ছুট বাচ্চারা তাঁদের ছুট হাত দিয়ে দেখিয়ে যেমন বলে ঐদেখ মা তালগাছে বাবুই পাখির বাসা।ঠিক এই দশা হবে রত্নার।
মঈন মিয়ার কথা শুনতে হলেও,হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো, তাকাতে হবে মঈন মিয়ার মুখের দিকে।
মঈন মিয়ার হাতে এক গ্লাস পানি দিতে গেলেও রন্তাকে মই ব্যবহার করতে হতে হবে।সত্যি বলতে একটা ধমক দিলে হয়ত হার্ট ফেইলিওর হয়ে যেতে পারে। যে মেয়ে এখনো ঠিক মত নিজের খাবার খেতে পারে না।সে মেয়ে কিভাবে অন্যের জন্য রান্না বানাবে।নিজের জামার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বুঝে না,সে কিভাবে কারোর কাপড় পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিবে।যে মেয়ে এখনো খেলার মধ্যে বিভূর থাকে,সে কিভাবে সংসারের বেড়া জালে নিজেকে আবদ্ধ রাখবে।একটা মুক্ত পাখিকে খাঁচায় বন্দী করা হচ্ছে মাত্র।যা পাখা এখনো শক্ত পুক্ত না।
যখন সে বুজবে তখন শুধু জানবে ছটফট করতে।
আর মুক্তি লাভের উপায় থাকবে না।
ওই ছোট্ট হাতে কিভাবে এর বড় লোকের দায়িত্ব নেবে।
এই বিষয়ে যে বাবাই উদাসীন।তার মত হতভাগা মেয়ে আর কে হতে পারে।
দুইদিন পর রত্না জানতে পারল আজ তার বিয়ে। তার বাড়িতে মামা,চাচা,জেঠা, বোন দুলাভাইদের আগমনে।
বিয়ে শব্দের সাথে পরিচিত না।রাখীকে গাছের নিচে খেলতে দেখে সেখানে দৌড়ে গেলো,আচ্ছা রাখি বিয়ে করলে কি হয়?
রাখি বললো, চল আম্মা কে জিজ্ঞেস করি।তারা জিজ্ঞেস করেও ছিল।সবাই হাসাহাসি করেছিল।আর বলেছিল,এই পাগুনিকে বিয়ে দিচ্ছে আবার।আল্লাই জানে কি না কি করে বসে।সবাই ওর প্রশ্ন কে মজার ছলে নিলো।আর ওই দিকে ভ্যাবাচেকা হয়ে ওরা আবার খেলতে চলে গেলো।বিকেলে ধরে এনে পাটিতে বসানো হলো।বললো, এখান থেকে উঠতে নেই।যতক্ষণ না আমরা তোকে তুলে নিচ্ছি।
পাশে রাখীকে নিয়ে ফুলন খেলতে লাগলো রত্না।
পাথর দিয়ে খেলা।হতে একটা কলাপাতার কচি পাতা আছে। একটু পর বর আসলো।রত্না কে বউ সাজানো হলো।তারপর বিসর্জন হলো কন্যার,সেই সাথে বিসর্জন হলো সকল প্রকার দায়িত্বের।এই বিসর্জনে কোনো উদঘাটন হয়না।শুধু হয় এন্ডিং।
বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেলো,মঈন মিয়ে আগে আরো একটা বিয়ে করেছিলেন।তার এইটা সেকেন্ড বিয়ে।যতই ছোট হউক না কেনো,রত্না ততদিনে অনেক কিছুই শিখে গেছে,জেনে গেছে আর বুঝেও অনেক কিছুই।তখন শুধু কান্না করে।আর বুজতে পারে বাবা তাকে সত্যি সত্যি বিসর্জন দিয়েছে।আমি হয়তো বেশি ছিলাম বাবার সংসারে।তাই তো আমাকে এমন ভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।কিন্তু তার অভিযোগের কোথাও জায়গা হয়না।তার কষ্টের কোনো সমাধান হয়না।
বিষন্নতার আকাশ ক্ষণিকের জন্যও রোদ্রের দেখা পাইনা।বাধ বাঙ্গা কান্নাও যেনো প্রকাশ পেতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে।
কিছুদিনের জন্য,তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া সেই বাবার বাড়িতে থেকে যায় রাগ করে এসে।বাবা মা সবাই বুজিয়ে বলে,কি করবা।আমরা জানতাম না,আমাদের ঠকানো হয়েছে।নইলে আমরা বিয়ে দিতাম না।
নিয়তি মানতে হবে মা।
ও তাই বুজে,আবার শশুরবাড়ি চলে যায়।পিছনে তাকিয়ে হয়তো মনে মনে বলে, এইবাড়ি টা আমার না।আমার ভালো লাগা হয়তো এই বাড়ির কেউ আর দেখবে না।আমাকে আমার সাথে লড়তে হবে।
কান্না ভেজা চোখে হয়তো বলতে চাই,আমাকে কেনো ঠকানো হলো।আমার জীবন নিয়ে এই ভাবে খেলার আগে মেরে ফেললেই হতো।
কিন্তু কে শুনবে তার হৃদয়ের কান্নার ধ্বনি।কে জানতে চাইবে আর মন ভাঙার গল্প।কে বা খুঁজ নেবে তার সুখ দুঃখের।তারপর থেকে আর কখনও রত্না বাবার বাড়ি আসেনি।কখনও নিজের কষ্টের কথা কাউকে জানাই নাই।কখনও সে বলে নাই,আমি ভালো নেই। দাঁতে দাঁত কামড়ে সে শশুরবাড়ি থেকে গেছে।না খেয়ে থাকলেও সে কখনও মুখ থেকে আ শব্দও বের করে নাই।
মঈন মিয়ে একদিন এই করে তো পরের এক সপ্তাহ বসে থাকে।এইদিকে শশুর শাশুড়ি তো আছেই।
ঠিক কয়েক মাস পর আখি মঈন মিয়ার প্রথম স্ত্রীর পক্ষের সন্তান বাসায় আসে।তখন মেয়েটার বয়স যে আট চলে।তাই বাবার বাড়িতে রেখে যায়।স্বামী পরিত্যক্ত মেয়ে মঈনের স্ত্রী নিজের জন্য কিছু করতে পারে না ।সে কিভাবে তার মেয়েকে নিয়ে এই ভদ্র সমাজে টিকবে।
তাই দিয়ে যায়। বাবার কাছেই নিরাপদ এই ভেবে।
এই দিকে বাচ্চা দেখে রত্না আরও ভেঙ্গে পরে।নিজের জন্য কোনো পথ খুঁজে পাইনা।
রাগে দুঃখে অপমানে সুইসাইড করতেও সে প্রস্তুত হয়।
কিন্তু তখনই জানতে পারে,তার মধ্যে ছুট একটা প্রাণ এর আবির্ভাব হয়েছে। এই জীবন আর এখন তার একার না।
এই জীবনের আরো একটা ভাগীদার চলে আসছে।যাকে এখন এই পৃথিবীর আলো দেখাতে হবে।
একটা মেয়ের জীবন যতটাই দুর্বিষহ হউক না কেনো,
মাতৃত্বের স্বাদ তাকে নিজের জীবনের মায়ায় আবার নতুন করে ফেলে দিবে।
যার বেতিক্রম হয়নি রত্নার ক্ষেত্রে।তাই সে চুপ হয়ে যায়।
নিজের মাঝে হাজারো যন্ত্রণার কবর দিয়ে আবারও সে বুক বাঁধে আশায়।একটা ছেলে সন্তান এর মুখ দেখে রত্না।ভাবে হয়তো তার জামাই তাই এইবার ভালো হবে।হয়তো তার মন মানসিকতা পরিবর্তন হবে।
কিন্তু না,কিছুই হলো না।বাচ্চার বয়স যখন দের বছর। ঋণে জর্জরিত মঈন মিয়া।বসে বসে খেলে ঋণ তো হবেই।তার উপর চার টা মেম্বার পরিবারের।মঈন এর বাবা মা আছেন।অথচ কোনো রোজগার নেই।
পরিস্থিতি যখন খারাপ,দুই বছরের বাচ্চা কে বাবা বাড়ি রেখে মঈন ও রত্না ঢাকায় চলে গেল।গার্মেন্ট করে দুইজনেই। ঋণ ও মোটামুটি শুধ দেওয়া শেষ ।
কিছু দিন ভালই চলল।
তারপর অনেক বড় জামেলা বাঁধলো,মঈন মিয়ার অভিযোগ রত্না রিলেশন করে।আর রত্নার কথা হলো,ফালতু চিন্তা ছেড়ে দিয়ে সংসারে মন দাও। এই নিয়ে নিত্য নতুন কথা কাটাকাটি হতো।এমন কি মাইর খাওয়া ছিল রত্নার নিয়মিত কাজ।
কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।সন্দেহের তীর বেড়েই চলছে।
অত্যাচারের লেভেল বেড়েই চলছে।
রত্না রাগ করে আবার দ্বিতীয় বার বাপের বাড়ি চলে আসলো।ঠিক এক সপ্তাহ পর রত্না জানতে পারল
মঈন মিয়ে তার প্রথম বউকে আবার বিয়ে করেছেন।
রত্নার এবার বুঝার বাকি রইলো না।কেনো মঈন মিয়া তার সাথে এত দূর ব্যবহার করেছে।নিজের বাচ্চা নিয়ে কয়েকদিন বাবার বাসায় কাটালো।দুঃখের কথা নতুন করে বলার কিছুই নেই।
কোথাও যাই না,নিজের প্রতি যত্ন নেই না।
মা বাবা বকা দিলে শুধু বলে, এখন এত ভালোবাসা দেখিয়ে আমার মনে জায়গা পাওয়ার চেষ্টাও করো না।
সে আবার নিজের বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়।
এইদিকে মঈন মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী আসছিল কিছু টাকা পয়সার লোভে।কারণ উনার ও একটা লাইফ পার্টনার জুটে গিয়েছিল।যে যায় হউক, মঈন এর প্রথম স্ত্রী আশা আবার পালিয়ে যায় ছয় মাসের মাথায় অন্য একটা লোকের সাথে।তখন মঈন বুজতে পারে, জীবনে সে কত বড় ভুল করেছে।সে আবার রত্নার খুঁজ করে ওর বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।বাচ্চাকে দেখার নাম করে।রত্না প্রথমে দেখা করতে না চাইলেও পরে আর পারে না। যায় করুন না কেনো,সন্তানের বাবাকে কখনোই সন্তানের থেকে দূরে রাখতে পারেন না।
পৃথিবীর কোনো ইতিহাসেই হয়তো এমন ঘটনা নেই।
না কোনো সংবিধান এ আছে এই নিয়ম।
কিছুই করার নেই,বাচ্চার অজুহাতে আবার তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়।এক পর্যায়ে মঈন ক্ষমা চাই।আবার তারা বিয়ে করে।রত্নাকে প্রশ্ন করা হলে বলে,
আমি যখন অবুঝ ছিলাম।তখন আমার বাবা মা আমার সাথে বেইমানি করেছে।এখন আমি বুজি,অনেক কিছুই বুজি।আমি জানি এখানে আমার সুখ হবে না।সুখ আমার সাথে শুট করে না।আমার বাবা আমাকে সুখী করতে পারে নাই।সেখানে আমি আর কোথায় সুখ খুজবো।
এত দিন সবাই আমার জীবন নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে।আজকে না হয় আমি জেনে বুজে আর একটা ভুল কাজ করি।
আমার বাবা নিজেকে বাঁচানোর জন্য আমার সাথে অবিচার করেছিলেন।
কিন্তু আমার নিজের সাথে নিজের অবিচারের একটা কারণ আছে,সেটা হলো আমার সন্তান।আমি চাই না আমার বাচ্চাটা বাবা ছাড়া বড়ো হউক।আমি চাইনা আমার বাচ্চাকে মানুষ অনাথ বলুন।
আমার বাবা নিজের ভালো জন্য কন্যা বিসর্জন দিয়েছিলেন।আমি আমার ভালো দেখতে পারবো না।আমার কাছে আমার ছেলের ভালো থাকায় বেস্ট।তার জন্য আমাকে যদি নিজেকে শত বার ভুল করতে হয়,সেটা করবো।
যে ছেলের পাশে বাবা নেই,তাকে এতিম ই লাগে।
আমি বেঁচে থাকতে সেটা মেনে নিতে পারি না।
তাই আমার এই বিয়ে নামক সেতু আবার তৈরি করলাম।আমার ভাঙ্গা সেতুতে যদি আমার ছেলের জীবন চলার পথ সহজ হয়,সেটাই হবে আমার মা হিসেবে সবচেয়ে বড় পাওয়া। চলতে লাগলো তার জীবনের যুদ্ধ।ছেলের বয়স যখন পাঁচ বছর।তখন তার আগের ঘরের মেয়ে আখিকে বিয়ে দেওয়া হলো।এখানে রত্না বাধা দিয়েছিল,বলেছিল কিছু দিন পর দেওয়া হউক।এখনো ছুট।
কিন্তু কেউ শুনে নি কথা।সবাই বলেছে,
সৎ মা। ওকি আর ভালো চাইবে। দেখো না ওর মাকে কিভাবে সরিয়ে দিয়ে নিজের জায়গা আবার পাকা করলো।অনেকেই বলতে লাগলো,মাইয়া বিপদজনক।
হয় এক ,মানুষ বুজে আরেক।গ্রামের মানুষের এই হলো এক সমস্যা।আসল ঘটনা না জেনেই ফ্যাক নিউজ এ বেশি বিশ্বাস কাজ করে।
সে যাই হউক,
সৎ মায়ের কথা আর কাজে আসে নাই।
মঈন মিয়া ঠিক এক বছর পর কার এক্সিডেন্ট এ মেরুদণ্ডের স্টেবিলিটি হারিয়ে ফেললেন।তার পা অচল।
যত টাকা পয়সা ছিল, সব খরচ করেও তাকে আর পুরুপুরি সুস্থ করে তুলা গেলো না।
গ্রামে চলে আসলেন।বিছানায় শুয়ে থাকেন।বসতেই পারেন না।কোমর থেকে পা পর্যন্ত অচল।সেন্স আছে কিনা নেই কিছুই বুজা যায় না।
শুধু কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত কাজ করে।কয়েক মাস পর ভাঙ্গা অংশে ঘা হয়ে গেলো।এত বড় বড় ক্ষত দেখলে গা শিউরে উঠবে। টানা সাড়ে তিন বছর রত্না বাবার বাড়ি যেতে পারেন নাই।তাহলে জামাইকে কে দেখবে।অনেক ঋণ করে গ্রামের ডক্টর নিয়ে এসে ঘায়ের পরিষ্কার করতেন।সেখানে ওষুধ লাগাতেন।
জামাই এর পাশে একটা ভূতকেও আসতে দেখেন নাই এই কয়েক বছরে।নিজের বাবা মা তার ঘায়ের পচা ঘন্ধে পাশে আসতেন না।ভাই বোনেরা ও আসতো না।
এক মাত্র মেয়ে আখি শশুরবাড়ি র অজুহাতে নিজের বাবার থেকে দূরে থাকতেন।
আজকে সেই মঈন মিয়ার মৃত্য হলো।
পৃথিবীর সমস্ত পাঠ শেষ হলো।
সেই সাথে এক মহীয়সী নারী রত্না বিবির জীবন সংগ্রামের পতন হলো।সে হেরে গেলো, সন্তানের বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা যেনো হেরে গেলো।
সবাই মাটি দিতে আসলেন।দেখলাম রত্না বিবি তার দশ বছরের ছুট ছেলেকে কোলে নিয়ে ভাঙ্গা সুলার ঘরের এক কোণে স্বামীর পচা গন্ধযুক্ত ঘরে বসে অঝোরে কান্না করতেছে।
বাকিরা বাইরে কান্না করতেছে। লাশের পাশে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব না।
রত্নার বাবা হয়তো কল্পনাও করেন নাই,আমি বেঁচে থাকতে আমার ছুট মেয়েকে বিধবা দেখতে হবে।
মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন চেয়ারে উপর।
তার জেঠাকে দেখে রত্না হাউমাউ করে কান্না করে দিলো।কারণ জেঠা রহমত মিয়ে ভাই জির পাশে গিয়েছেন। রত্নার হয়তো সেই মুহূর্তে তার জেঠাকেই সবচেয়ে আপন মনে হয়েছে।কারণ এই জেঠাই এক মাত্র বিরুধি পার্ট ছিল তার বিয়ের।নিজের ভাই রহিম কে মানাতে ব্যর্থ হয়েছেন।তিনিও কান্না করতে লাগলেন।
কারণ তার বংশের প্রথম কোনো জামাই এর বিয়োগ হলো।এই প্রথম তাদের ছুট মেয়ে কাঁচা জীবনে ঘুনে ধরলো।বিধবা বেস ধারণ করলো সেই রঙ্গিং জীবন।
সেই সুন্দর মুখের হাসি চিরো তোরে বন্ধ হয়ে গেলো।
অথচ রহমতের সেই ছুট মেয়ে রাখি এখন বিএসসি ফাইনাল ইয়ার এ পড়তেছে।
অন্যদিকে রাখির সমবয়সী রন্তা আজ জীবন সায়ন্নে। বিধবা খেতাব পেয়ে গেলো,শুধু মাত্র বাবার অবহেলা আর অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তে।
আমরা এই সব কে নিয়তি বলেই চালিয়ে দেই...
কত সহজ আমাদের হিসাব তাই না?
হাস্যকর....
Comments
Post a Comment