প্রলাপ 4
প্রিয়জন
এই শব্দটা কে কিভাবে নেই।সেটা আমি জানি না।
কখন ই বা এই প্রিয়জনের মুখ মানুষের মনের আয়নায় ভেসে উঠে।সেটা জানতাম না।
মানুষ যখন সজন থেকে পাওয়া কষ্ট আমাকে শেয়ার করতো।আমি ভাবতাম,কি আজব।নিজেরই তো। অন্যের কাছে এই বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার কি আছে!
আমার দাদী মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে,আমি বাড়ি গিয়েছিলাম।সন্ধ্যার দিকে আমি বাড়ি যেতাম সবসময়। আমি বাড়ির গেট পার হয়ে রুমে যায়ই নাই,তার মধ্যেই দাদি আমাদের বাড়ির গেটে।
বুবু আইসো?
আমি আশ্চর্য হলাম,,দাদু এই লাঠি ভর করে কিভাবে একই সময় আমাদের বাড়িতে!
আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।আমার হাত, মুখে চুমু খেলেন।বললেন,বুবু আজকে আমি তোমাকেই মনে করতেছিলাম। একটু পর পর তুমার কোথায় মনে হচ্ছিল, কবে থেকে আসনা বাড়িতে।
বললাম,আমি যেতাম তোমার কাছে।কষ্ট করে আসতে গেলে কেনো?
আমার মন কেনো জানি বলল,তুমি আসছ বাড়িতে। তাই আসলাম। দেখছ,আমার মন ঠিক শাই দিয়েছে।
দেখি কান্না করতেছে।
শান্তনা দিলাম দাদুকে।
যখন আমি ছুট ছিলাম,আমার বড় আপুর বিয়ে হয়েছে পাশের এলাকায়।আপুকে প্রায় ভোররাতে চিৎকার করে কান্না করতে করতে বাড়ির দিকে আসতে দেখতাম।
আপুর কান্নার শব্দ শুনে আব্বা,আম্মা সবাই বন বরাবর আপুর দিকে দৌড়ে যেতো।আর আমরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম আপুর বাড়ি আসার অপেক্ষায়।
বাসায় আসলে আপুকে আব্বাকে কখনো বা আম্মাকে ধরে কান্না করতে দেখতাম।আপু বলতো,আব্বার এইটা হয়েছে আজকে স্বপ্নে দেখি,আম্মার এইটা হয়েছে স্বপ্নে দেখি।
কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলেই,আপুকে ওই বাড়ির কেউ ধরে রাখতে পারত না।
হউক সেটা মাজ রাত,অথবা অন্য সময়। দশ মিনিটেই বাড়ি এসে উঠতো আপি ঝড়ের বেগে।
আমার মনে আছে দাদুর মৃত্যু কালে দুপুরে বাড়ি আসছে।বলতেছে আব্বা, দাদা কি অসুস্থ?আমি দাদাকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছি।তাই দাদাকে দেখতে আসছি।
কিন্তু সেদিন ছিল শুক্রবার।আপি এসে দেখেন দাদা মসজিদে গেছে।আব্বাও চলে গেছে মসজিদে।
কিন্তু সেদিন দাদা মসজিদ থেকে ফিরে আসেন নাই জীবিত।
আসলে প্রিয়জন এর বিষয়ে খারাপ কিছু কল্পনাও মানুষ করতে চায়না।যা আপুকে দেখেই বুঝেছি।
একবার আমি বাবার সাথে রাগারাগি করেছিলাম।সাবজেক্ট ছিল,আম্মাকে হুদাই পেরেশানিতে রাখা।
ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছি, ইদের জাস্ট দুইদিন আগে বাড়ি গেছি।সেদিনই ফেরত আসছি মেসে... রাগ করে।
সে বার ঈদ করেছিলাম, শায়লা দের বাড়িতে।জীবনের প্রথম কোনো ঈদ,যা অন্যের বাড়িতে।আমার আব্বা কল দিতে পারে না।যদি কেউ কল দেই,শুধু রিসিভ করে কথা বলে।মেজু ভাই,সেজু ভাই,ছুট আপি,বড় আপি, ভাগনে, ইভেন হারুন কেউ বলেছে।আমি যেনো কল দেই।আমি যেনো বাড়ি চলে আসি।
আমি যায় নাই জেদ করে,,,,কারোর কথায় শুনি নাই।
ঈদের দিন বিকালে ,আম্মা বলতেছে।বাড়ি আসো। তোমার বাবা আজকে এই একটা ঈদের দিন
কিছুই খাওয়াইতে পারলাম না।
তুমার বাবা খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।
আর তুমি রাগ কইরো না,আমি চল্লিশ বছর থেকে এই একই বিষয় মেনে নিয়েই এই বাড়িতে আছি।
তুমাদের মন খারাপের কিছুই নেই।
সেদিন বুঝেছিলাম,আমার বাবাও আমার আম্মার জীবনে অভ্যেস নামক ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।
আব্বাকে ফোন এই বললাম,কালকে সকালে আসতেছি।
দেখি কান্না করতেছে।আমি জীবনের প্রথম বার আব্বাকে সেদিন কান্না করতে শুনেছিলাম।
মেয়ে মানুষের জন্য কান্না করতে হয়না বাবা।আমার নানু র কিন্তু বড়ো মেয়ে ছিল আম্মা।তুমি ভালো রাখো নাই।
আমাকে ও ভালো রাখার দায়ে কেউ থাকবে না।
আমাদের জন্য অযথা পানি ফেলো না।এইটাই মেয়ে মানুষ।
আমি সকালেই আসতেছি।
আব্বাকে আম্মা সেদিন ও কিছুই খাওয়াইতে পারে নাই।
আমি আসলে,তারপর খাবার আমি খাওয়াইছি।
আব্বার সেদিন থেকে অনেক চেঞ্জ। বাবা এক রোখা ছিল।অনেক রাগী লোক। আমি কখনও আব্বার চোখের দিকে তাকাইতে পারতাম না।
সেই আব্বার এত পরিবর্তন।
শুনেছি মানুষ যখন কষ্টে থাকে তখন নাকি সব প্রিয়জনের মুখ এক এক করে ভেসে উঠে চোখের সামনে।
আমার জীবন এখন এমন পর্যায়ে দাড়িয়ে আছে।
মানুষ মৃত্যু কালে হয়তো বলে অমুক আসে নাই।
তমুক আসেনাই।
আমিতো সেটাও পারি না বলতে।
অথচ আমার চোখের সামনে সবসময় আব্বাকে দেখি।
আমি যখন শুয়ে শুয়ে নিজের সাথে যুদ্ধ করি, অনেককে ই মনে হয় আমার।আমার যন্ত্রণার ভাগ আমি কাউকে দিতে পারি না।আমি বলতে পারিনা,আমি ভালো নেই।
আব্বাকে ও না..
কারণ,বাবার এখন আমার যন্ত্রণার ভাগ নেওয়ার বয়স নেই।আম্মাকে ও বলতে পারি না।
কারণ আম্মা ,আব্বার বান্ধবী।
কখনোই থাকবে না গোপন।
আমার চোখ,
মনের এমন এক প্রতিবিম্ব কে দেখতে থাকে যেটা বাঁচার প্রতি লোভ জন্মায়।
একদিকে চোখের পানি ঝরে,অন্যদিকে ফাফুরে দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।তখন যেনো অজান্তেই কোনো হাসির রং আমার মনকে আশ্বস্থ করে।
সন্ধ্যার গোধূলির মত ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের কিছুতেই যেনো আমার অন্তর আত্তা শান্তি খুঁজে পাই।
আমার হাজারো যন্ত্রণা যেনো উপশমের সন্ধান পাই। চাপা দিয়ে রাখা চিক্কার গুলো যেনো কিছুটা গতিবেগ পরিবর্তন করে।
আমি কি বাঁচবো?
আমার কি কখনও ঘুরে দাঁড়ানো হবে?
আমার জীবনে আসবে কি কোনো ছন্দ?
এই প্রশ্নদের যেনো কিছুক্ষণের জন্য মৃত্যু ঘটে।
আমার সব সংকট,সব হতাশা,আর সব অনিশ্চয়তার মাঝে এক মহা সমুদ্র আশা জাগিয়ে দেই একটা সত্য।সেই সত্য আমার প্রিয়জন।
হ্যাঁ আমারও একটা প্রিয়জন আছে।
যাকে ভাবলেও যেনো আমার মাঝে নতুন করে জীবনের জন্ম হয়।আমার চোখে মুখে পরম শান্তির ছায়া ফুটে উঠে।আমি নিজেকে কিছুক্ষনের জন্য হলেও ভালো দেখতে পাই।
আর কষ্টও হয়,ঠিক সেই রকম।যেমন আমার দাদু,আপু,বাবা,মা এদের কে দেখেছি।
Comments
Post a Comment