মা

 ছুট সময়ের কথা ঠিক মনে নেই,,,

তবে আমার ক্লাস ফাইভের পরের জার্নি টা সেরকম মনে না থাকলেও,,,,আম্মার কিছু কিছু কথা আমার ভালই মনে আছে।

আমি সম্ভবত কোনো দিন স্কুল মিস দেই নাই।

কারণ  স্কুলে যেতে হবে।কখনও শরীল খারাপের বাইনা হয়নাই আমার থেকে।

শরীল খারাপ হইয়ো নাই।

নানু বাড়ি যাবো,খালার বাড়ি যাবো,আপুর বাড়ি যাবো।

এইসব বাহানারা আমার মন কে বসে আনতে পারে নাই।

আমি সেরকম ঘুরা ফেরা পছন্দও করতাম না।

আমার আম্মা অনেক কাজ করত।পুরু সংসার একা হাতে সামলাত।

আমি আম্মাকে প্রায় প্রত্যেক দিন দেখতাম সকালে উঠে আম্মা ধান সিদ্ধ করতেছে।আব্বা ধান চালের ব্যবসা করতো। চাল বিক্রি বেশি করত তার কারণ,,,গরুর খাবার বের হয় তাতে।আমাদের কিন্তু স্কুলে যাওয়ার আগে খাবার ঠিকই দিত আম্মা।যায় রান্না করুক,,,করে ফেলত।কেমনে জানি না।কিন্তু খাবার রেডী।সেই মধ্য রাত থেকে সকাল দশটা পর্যন্ত ধান সিদ্ধ করত।আবার সেটা সারাদিন রোদে দিয়ে শুকানো।কখনও দুই তিন লেগে যেতো ধান শুকাতে।এত কাজ করত আম্মা,

কখনও আমাকে পেরা দিত না।

একদিন,,,,আমি সম্ভবত নাইন এ পড়ি।

আম্মাকে বললাম আজকে যাবো না স্কুলে আম্মা।

তুমাকে হেল্প করবো। তুমি আজকে বেশি ধান সিদ্ধ করেছো।সেই দিন দাদু বাড়ির উঠানেই ১৫ মন এর মতো ধান শুকাতে দেওয়া হয়েছিল।আমাদের বাড়ির উঠানে তো ১০ মন এর বেশি হয়। দুই বাড়িতে আম্মার পেরা হয়ে যাবে।তাই আমি বাড়ি থাকতে চাইলাম।

আম্মা আমাকে বলল,

তুমার কাজ আমার চাই না।তুমি স্কলেই যাও।ওটাই তুমার আগে দরকার।আমার কাজ আমার কপালেই থাক।ভাবলাম,,,রাগ করে বললো নাকি?

যাচাই করলাম।বললাম,,,আলী ভাই থাকতে বলেছে।

আম্মা বললো,কইছে তোমারে।স্কুলে না যাওয়ার বাহানা।

তখন বুজলাম,,,আসলেই আম্মা চায়না আমি কাজ করি।স্কুলে যেতে বাধ্য হলাম।সেদিন অনেক ঝর হয়েছিল।অথচ আম্মা আর আব্বা একাই।

আমরা ভাই বোনরা সবাই স্কুলে।

যখন আমি ক্লাস টেনে উঠলাম,তখন আমি মেলান্দহ যায় প্রাইভেট পড়তে।সকাল সাতটার ব্যাচ।আমাকে হেঁটে যেতে হতো।কারণ সেই ভুর রাতে আমি গাড়ি পেতাম না।আর রাস্তা ছিল না। হেঁটে গেলে দের ঘণ্টার বেশি লাগবে।আমি বের হতাম পাঁচটার দিকে,আম্মা আমাকে গরম ভাত ঠিকই খাওয়াই দিত। টেস্ট এক্সাম এর আগে আমি রাত তিনটাই উঠে রওনা দিতাম।একা হেঁটে,,,একদিন আম্মা কান্না করেই দিলো।বলে কত রাত কি না কি হয় রাস্তায়।গ্রাম তো।তাই ভয় লাগতো না।

তখনও আমার আম্মা আমাকে খাবার দিত,,,,বক্স এ খাবার তুলে দিত।আম্মাকে একদিন বললাম,,,তুমি ঘুমাও না আম্মা রাতে।কখন কি করো?

আম্মা বললো দুই চুলায় ধান বসিয়ে দেই,,,পাশেই ছুট চুলায় ভাত বসাই।হয়ে যায়।

সমস্যা হয়না তো।আমার আম্মা কেনো জানি না আমাকে কোনো সময় কোনো কাজই হুকুম দিত না।

এসএসসি এর বাইরে চলে আসলাম।

আজও আমার আম্মা আমাকে এক গ্লাস পানি নিজ হাতে নিতে দেইনা।অবশ্য আমি অসুস্থ বলে,আমাকে আরো বেশি কাজ থেকে দূরে রাখে।


আজকে আমি আর সেই ছুট মানুষ নেই।অনেক কিছুই বুজি।বাবা মায়ের শরীল এর দুর্বলতা আমাকে অসম্ভব যন্ত্রণা দেই। সকালে কেনো যেন বলে ফেলেছি,,,আব্বা আমি বাড়ি যাচ্ছি আজকে।

হইছে,,,এসে দেখি আমি যেখানে ঘুম আসবো,,,,বিছানা করেছে।রোমের প্রতিটা কোন পরিষ্কার।ময়লা নেই,,,,

আমার কম্বল রেখেছে বের করে।বললাম

এইসব কেনো করছ আম্মা? তুমার না কোমরের সমস্যা।

আম্মা হাসি দিয়ে বলল,,,আমার কাছে তুমার সমস্যা আগে ।আমি এমনি থাকবো।শরীল আর ভালো হবে না।

যায় হউক বুরকা খুলে ওয়াশরুমে গেছি,দেখি আম্মা বাইরে লাউ শাক ধুচ্ছে।আমি পিছনে।দেখি আম্মা টিউবওয়েল চাপতে পারে না।অনেক কষ্টে পানি বের করতেছে।ধমক একটা দিলাম। একে তো রোজা।তারপর শরীল ভালো না। ট্যাব থেকে পানি না নিয়ে টিউবওয়েল চাপতেছে।কেমন টা লাগে?


 আসরের নামাজের সময় হয়েছে বলে বললাম,,,

ওযু করে নামাজে যাও।আমি শাক পরিষ্কার করতেছি।

দিবে না জুর করে নিলাম।

শাক ধুইলাম।ওযু করে আমিও নামাজে গেলাম।

দেখি আম্মা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বললাম,,আম্মা আমি রান্না করি আজকে?

হাসতেছে,,,,বলতেছে মাছ ভাজব।

তুমি এখান থেকে চলে যাও।আমিও চলেই আসলাম।

আমার কাছে আম্মাকে হেল্প করতে চাওয়াটা কেমন জানি নিছক স্বপ্নের মত লাগে।যা কখনোই বাস্তবে হয়ে উঠবে না।জীবন আমাকে চরম দুর্ভোগে ফেলে দিয়েছে।

যায় হউক,,,

ঘুরে ফিরে আবার আম্মার পাশে আসলাম।দেখি চাল ধুয়া পানি রাখছে বালতিতে।বললাম কি করবে এইটা আম্মা? বললো গরুটিকে পানি দিবো।আমাদের একটা গরু আছে।বললাম আমি দিয়ে আসি।আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে এমন হাসি দিলো।বলতেছে তুমি গরুর কাছে যাবে।কোনোদিন সাহস পেলে না।

বললাম এইটা তো বাচ্চা গরু।পারবো।

দেখি আম্মা কিছু বলল না। গেলাম,

চারিতে পানি দিলাম।গরু নাগাল পাইনা পানি।

কি করি? সাহস করে দড়ি খুলে দিতে গেছি,,,,,

হলো না খুলা। আম্মাকে আসতেই হলো।

দড়ি খুলে লম্বা করে বাঁধলো। আর 

আমি মনে মনে ভাবলাম,,, আমার জীবন কারোর কোনো কাজে আসবে না। আম্মাকে আসতেই হলো। কি হবে আমাকে দিয়ে। দেখি আম্মা ভাতের পাতিল নিয়ে যেতে পারে না হাত পা কাপে।কোমরে অনেক বেথা করে।বুকের পাঁজরে ও নাকি ব্যথা।আজকে ইফতার করতে সময় শুনলাম।

আমার খালি মনে হয়,আমি যদি পাশে রাখতে পারতাম আম্মাকে।নিজের মতো করে আমি মাকে যত্ন করতে পারতাম।যদি অভাব আমার জীবনে না থাকতো।

আমার আজকে অনেক টাই দম বন্ধ লাগতেছে। আব্বা বলতেছে এই ঈদে সার্জারি করতে হবে।হয়তো বাসা থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করতেছে। ভাইদের মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না।আম্মা আব্বাকে কিছুই বলতে পারি না।এদিকে নিজের অসুস্থকেও আর কারোর সামনে প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে না।যতটুকু দেখে বুজে ততটুকুই। যন্ত্রণা গুলো আমার ভাষায় প্রকাশ পায় না।

আমার সেই মাকে অনেক মিস করে যে মা একাই একশো ছিল।যার কাজ করতে কষ্ট হতো না।

আমার আম্মার এই অপারগতা আমাকে মা হারানোর ভয়কে চরম ভাবে উত্তেজিত করে তুলে।সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে,,,আম্মার শরীল খারাপ।অথচ কিছু করতে পারছি না।আমার পরিবারের দিকে তাকালে মনে হয়

কিছু লাগবে না জীবনে ।টাকা হলেই হবে ।কিন্তু আমি কি করবো। 

হে আল্লাহ,আমাকে আপনার রহমতের আলোয় আলোকিত করুন।

আমিন


Comments

Popular Posts