মেস থেকে যা দেখেছি,,,

আমার মেস লাইফ প্রায় আট বছর শেষ হলো বলা যাই।

ইন্টার সেরকম বুঝেই উঠতে পারি নাই।যখন অনার্সে উঠলাম,,,তখন থেকেই একটু একটি বুধ বুদ্ধি খাটিয়ে কোন বিষয়কে দেখা শিখলাম।

ঘটনা 1

তখন নিউ সেকেণ্ড ইয়ার এ পরি 

একদিন মিল ক্লাস করতে মেনেজের আসছে।আমার কাছে বাজেটের থেকে এক টাকা বেশি পাইবে। এখন কয়েন মানে, খুচরা কোনো টাকায় নাই। ম্যানেজারের কাছেও নাই।

কিন্তু যায় পাওয়া হোক না কেন,,,দিতে হয়।না হয় কিছু টাকা গরমিল বাজে।যা ম্যানেজারের কষ্ট হয়ে যায় মিল ক্লোজ করতে।তো আমার রুমমেট ওর ও আবার দুই টাকা এক্সট্রা দিতে দিতে হবে বাজেটের থেকে।হলো টা কি,,,

ওকে আমি বললাম,আমার তো এক টাকার কয়েন নাই।তুই ম্যানেজার কে পাঁচ টাকা দিয়ে, দুই টাকা ফেরত নিয়ে নে। মানে আমার এক টাকা টা এইবার তুই দিয়ে দে।

এরকম বহু জামেলা রুমমেট হিসেবে ফেস করেছি আমি। নিজেও ওদের কতবার এমন সমস্যাই হেল্প করেছি।কারণ,,,এটাই নিয়ম।কিন্তু একটাকা বা দুই টাকা কি পরে চাওয়ার জিনিস! 


যায় হোক,

পরের দিন সে আমাকে বললো এই নে চার টাকা।দুইটা দুই টাকার নোট দিলো সে আমাকে।বললো,,,পাঁচ টাকা আমাকে দে তুই।আমিও খুচরা করে এনে দিয়ে দিলাম।মনে মনে হাসলাম,,,,

ঘটনা 2

এইতো সেদিনের কথা,,,,ফাইনাল ইয়ারে পড়ি।সকালে ডিম সিদ্ধ দিতে গেছি আমি।গিয়ে দেখি দুইটা চুলায় বন্ধ।একটা চুলায় একটা ডিম সিদ্ধ দিয়েছে কে যেনো। আরেকটাই তরকারি করতেছে কে যেনো।পাশেই আরেকটা ডিম রেখে দেওয়া।জিজ্ঞেস করলে জানতে পারলাম,,,,যে চুলায় ডিম সিদ্ধ দেওয়া,ওই চুলাটা একজন সিরিয়াল নিয়ে রাখছে ।এই ডিম হলেই,,সে চুলার পাশে রেখে দেওয়া ডিম টা সিদ্ধ দিবে।আমি বললাম,,,এইটা কার ডিম চুলায়। মেসের একজন সিনিয়র বলা যাই,সে আসলো রান্নাঘরে।সেই ডিম সিদ্ধ দিয়েছে বলল।আমি বললাম,,,,এখানে এই ডিম টাও তো দেওয়া যায়।

সে বলল,না হবে না।

আমিও সিনিয়র ই।চাইলেই একটা কাহিনী করতে পারতাম।কিন্তু তার মেন্টালিটির দিকে ভেবে নিজেরই বমি হাসলো।কথা বাড়ালাম না।রান্না ঘর থেকে চলে আসলাম।

অবশ্য পরের মেয়েটা তার ডিম সিদ্ধ দেওয়ার সময়,আমার রুমে এসে আমার ডিম টা নিয়ে গেছে।বলেছে দেন,এক সাথেই সিদ্ধ দেই।

ঘটনা 3

আমি প্রত্যেকদিন সকালে উঠে চা বা কফি না নিলে ঠিকঠাক মাথা কাজ করে না।ঘুমের যুদ্ধে বিভোর থাকি।

তাই ঘুম থেকে উঠেই পানি গরম দিয়ে,ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে।এসে কফি পান করি।

সেদিন ও গিয়েছি,,,, যথা নিয়মেই।দেখি একজন পানি গরম দিয়েছে।আমাদের মেসের গ্যাস লাইট টা নষ্ট হয়ে গেছে কোনো কারণে।সে তার গ্যাস লাইট টা ঝালিয়ে চুল ধরাইছে।

আমি বললাম,,,তুমার পানি তো হয়েই গেছে। চুলা অফ করো না।আমিও একটু পানি গরম করবো। আমি দাড়িয়ে আছি পানির পাতিল হাতে নিয়ে,,সে ঠাস করে চুলা অফ করে দিলো।সেতো আর মুখে বলবে না,,,,তবে মুখের চেহারা দেখেই বুঝলাম। আগুন ধরানো চুলা সে দিবে না। কারণ সেটা সে ঝালিয়েছে।😑😑😑😑

পরে আমি আমার রুম থেকে লাইট নিয়ে অন করে পানি গরম দেই।


ঘটনা 4

আমি তখন নিচতলা থাকি।আমার সেজু ভাই আমার জন্য আমের আচার পাঠাইছে।আমার কাছে কোনো কিছু আসলে সবাইকে দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করি।নিচতলা সবাইকে দিলাম।চার তলা এক বান্ধবী আছে। তাকেও পাঠালাম আচার। ও আমার বিশেষ বিন্দু😍😍তিনতলায় আছে পরিচিতি,,,,তবে আমি ওদের জন্য পাঠাই নাই।কিন্তু একদিন আমার কাছে গিয়েছে,আমি দিয়েছি।আর যেকেউ রুমে গেলে আপ্যায়ন না করলে হয়।দিলাম,,,,

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আমার সেই তিনতলার বন্ধু একটা,,,, ও চার দিন আচারের লোভে আমার কাছে গেছে।আমি সিরিয়াসলি এইটা ভাবি নাই।খেয়েও আসছে।আরেক দিন গেছে,,,,ততদিনে আমার আচার শেষ।আমি তার থেকেও শুনেছি,,,,আমি নাকি ঠিক মনের মানুষ না। আমি যখন তিনতলায় উঠলাম। ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ওদের সাথে পরিচয়,,,আমি যা বানাইতাম, চুলা ঘর থেকেই ওরা খাইতো।কিন্তু আফসুস,,,ওরা শুধু বদনাম করতেই জানে।অথচ তারা কখনও কোনো দিন আমাকে কিছু দিয়েছে কিনা ,সন্দেহ।

ঘটনা 5

আমি আমার ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে মুটামুটি কষ্ট পেয়েছি।যারা পরিচিত,,,,যোগাযোগ রাখি।এখানে আমার সাথে এক মেসে যারা আছে।ওদের মধ্যে এক জনের সাথে কথা বলি না আমি। কথা না বলার কারণ টা এখানে বলার কোনো দরকার নেই।

আমি একদিন বড় আপুর বাড়ি গিয়েছি কোনো প্রোগ্রাম আছে। প্রোগ্রাম মানে ,মিলাদ।আমাকে যেতেই হবে,আপু কান্না করছে বলে যাবো।

আমার রুমমেট দুইটা ছুটো মানুষ তো,,,শুধু বলে আপু তুমি টিউশন করাও,আমাদের কিছুই খাওয়াও না।

আজকে আসার সময় বিরিয়ানি আনবে।তুমি একাই খেয়ে আসবে ভালো মন্দ, হবে না এইটা।বললাম, চল যাই? বললো,না আমরা যাবো না।

তারপর ফিরে আসার সময় পাঁচ রাস্তা থেকে তিনটা বিরিয়ানি নিয়ে আসলাম। আসলে আপুর কাছে আমি জাস্ট ফর্মালিটি  মেইনটেইন করতে গিয়েছি।আমার আপুর কাছে গেলে ভালো লাগে কারণ আপুকে দেখতে পাই।অন্য কোনো বিষয় এ ভালো লাগা নেই।আমি না খেয়েই চলে আসলাম। 

মেসে আসলাম রাত সাড়ে আটটা বাজে।ওদের হাতে খাবার টা দিয়ে আমি কাইত বিছানায়।কোনো রকম ফ্রেশ হয়েছি। সারাদিন টিউশন করেছি,ওখানে গিয়েছি।আমার শরীল চলছে না।আমি ঘুমিয়ে গেছি।ওরা রাত দশটায় খাবার খেয়েছে।আমাকে ডেকেছে,সেটাও আমি জানি না। সকালে উঠে দুইজনেই হাসে আমাকে দেখে।আর বলতেছে আপু তুমার টাও আমরা খেয়ে ফেলছি।আমি বললাম,,,,সমস্যা নেই।আমি খাওয়ার মোড়ে নেই।খেয়েছিস ভালো করেছিস।নষ্ট তো হয়নাই।

তারপর ওরা দুইজনে দুইজনের দিকে তাকাই আর হাসে।পিচ্ছি গোসলে গেলো।আমি আর স্মৃতি রুমে।তখন স্মৃতি বলতেছে, আপু জানো রাতে কি হইছে?

বললাম,নাতো।আমি কিভাবে জানবো।

বলে নিপু আপু আছে না।উনি আমাদের দরজায় উকি দিয়ে দেখলো যে আমরা খাইতেছি এই সব বের করে। দই,মিষ্টি আর খাবার....আপুটা রুমে আসলো,একটি মিষ্টি খাইলো।আমাদের বললও না।তারপর উনি উনার রুমে গেলো,একটা বাটি নিয়ে আসলো।এসে একটু দই নিলো।তাও আমাদের বলল না। তারপর একটু পর আবার আসছে,প্লেট নিয়ে।এইবার এসে বলতেছে এই গুলো তুমাদের কে দিয়েছে?

আমরা বললাম,হালিমা আপু আনছে আমাদের জন্য। তখন বলতেছে,আমি একটু বিরিয়ানি নেই? তুমার আপুকে বইলো না। বলেই একটা মাংস আর বিরিয়ানি নেওয়া শুরু করলো।পিচ্ছি তখন বলল,এইটুকু আপুর জন্য রাখছি।আপু এখন খাবে না, ঘুম আসছে আপি।সকালে উঠে খাবে।আপুর জন্য গরম করে আমরা রেখে দিবো। আমাদের কোনো কথা শুনলো না।তারপর ও কিছু নিয়ে চলে গেলো।

বাকিটা তুমার জন্য রাখছি গরম করে।আমাকে পাতিল দেখাইলো।

আমি বললাম,আমি তো খাবো না।তরাই খেয়ে নে যেহেতু রাখছিস।আমি তো রাখতে বলিও নাই।ভেবেছিলাম, তোরা যদি আমাকে রেখে না খাস,তাই এক প্যাকেট বেশী নিয়ে আসছি। আমার ইচ্ছে নেই। মন ভালো ছিল না আমার। ও বললো, আপি জানো সেদিন জুর করে আমাদের থেকে ভর্তা ও খেয়ে গেলো।আমরা রুমে,,,তুমার জন্য একটু রাখছি।বাকিটা আমরা খাচ্ছিলাম।কিন্তু উনি এসে এমন করলো।আমরা কি বলব,বড় মানুষ।কিন্তু এক জনের রুমে নিজ ইচ্ছাই ডুকে এমন করে।এমন কেনো উনি? আমি বললাম, ও এমন ই।আমি তো চার বছর থেকে চিনি...খেয়েছে খেয়েছে শেষ।এইটা নিয়ে কোথাও হাসাহাসি করিস না।কাউকে বলিস ও না কিছু। ও আমাকে জানাতে না করছে কেনো জানিস,কারণ ওর সাথে আমি কথা বলি না।অথচ আমার নিয়ে আসা খাবার খাওয়ার লোভ সামলাতে পারছে না। খেয়েছেও 

যদিও।এখন আমি জানলে কেমন না।তাই না করেছে।.... দই আর মিষ্টি আপু দিয়েছিলো ।আমি কিছু খাইনি বলে আসার সময় জোর করে বেগে দিয়ে দিয়েছিল। দিয়েছিস ঐটাই ভাল করেছিস।বড়দের মানতে হয়। ও ওর কাজ করেছে। তোরা তো আবার বেশি বাড়াবাড়ি করিস নাই?

বললো না আপি,শুধু পিচ্ছি তুমার কথা বলছে যে আপুর জন্য রাখবো এইটুকু।আর কিছু বলি নাই আমরা।

বাদ দে এই বিষয়,

আমি সেরকম কিছু মনেও করি নাই।

মনে মনে ভাবলাম, ওরা নিজেও জানে,এই সব ব্যবহারে মানুষের কাছে নিজেকে কতটা ছুটো করে ফেলে তারা।

ঘটনা 6

একদিন আমাদের মেসে খালা আসে নাই। এইটা মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা,,,, আমি যেদিন খালা আসে নাই,সেদিন থেকে পরের দিন রাত অব্দি কিছুই খাইনাই। মানে রান্না করার সাহস হয়নাই আমার।ডিম ভাজি পারি,কিন্তু আমার ইকোনমিক সমস্যার কারণে ডিম ও কিনতে বা বাইরে গিয়ে খাবার নিয়ে আসাও সম্ভব হচ্ছিলনা।আমি মিল থেকে চাইলে কিছু রান্না করতে পারতাম,,,,রান্নার জাঝে আমার পরের দুই দিন অসুস্থতায় কাটবে ভেবে,গেলাম না। এই দিকে আমার রুমমেট দুইটা ওরা মাত্র দুই তিন মাস থেকে আমার রুমে উঠছে।দেখলাম,,,একজন রান্না করে খেলো।আরেক জন বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসে খাইলো।এমন না যে তাদের সমস্যা,পারে না রান্না।পারে,,,,কিন্তু কেউ আগাচ্ছে না।আমি পারি না,তাই আলাপ ও তুললাম না রান্নার বিষয়টি।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় টিউশন গেলাম।রাতে স্টুডেন্টদের কে পরিয়ে মেসে ফিরলাম,,,প্রায় সাড়ে দশটা দিকে। সত্যি হলো,আমার স্টুডেন্ট দের থেকে একজনে আমাকে খাওয়াই দিয়েছে।প্রত্যেকদিন দেই না।কিন্তু সেদিন শান কে লাস্ট পরাইলাম।ওর মা মাঝে মাঝে আমাকে খাবার দেই।সেদিন হয়ে গেলো,,,,কেমনে জানি।আমি অনেক খুশি।খেয়ে আসলাম,,,মেসে এসে জিজ্ঞেস করলে,জানলাম ওরাও রাতে খেয়েছে।দুইজনেই ডিম ভেজে খেয়েছে।তারপর আমি ঘুমিয়ে গেলাম। পরের দিন সকালে উঠলাম।একজন ডিউটিতে যাবে বলে কিছু বানিয়ে খেয়ে চলে গেলো।আরেকজন কলেজে চলে গেলো।

আমি  বিকেলে আমার এক ফ্রেন্ডের থেকে টাকা ধার নিয়ে খাবার কিনে রাতে মেসে ফিরলাম।এসে খাচ্ছি ওদের সামনেই।ওরা বসে আছে।বললো,একজন আমাকে বললে নাতো আপু যে বিরিয়ানি কিনবে? আমি বললাম,আমি জানবো কিভাবে যে খাবি। তোরা তো খাচ্ছিস ই নিয়মিত....

সে বলল,না এইটা খাইতাম।ওকে দুই নলা মুখে দিয়ে দিলাম।আরেক জনকেও দিলাম দুই মুঠু।বাকিটা আমি খেয়ে বেসিনে গেলাম হাত ধুইতে।।একজন সিনিয়র আমাকে বলল,তিনদিন থেকে খাও না।তোমাকে রান্না করতে দেখলাম না।আমি খেতে বললাম তাও খেলে না। এই আজকে খেলে। এইভাবে বাঁচবে? বললাম,আপি আমি গত কালকে স্টুডেন্টের বাসায় খেয়েছিলাম।আজকে খাবার নিয়েই আসছি সমস্যা নেই।আপনি চিন্তা করবেন না। আসলে উনি সবার সিনিয়র এই মেসে।উনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন মাঝে মাঝে খালা না আসলে।

আপুর সাথে সেখানে আরো এক জন ছিল। সে আমাদের কথা শুনছিল। হঠাৎ সে বলল,আপনার রুমমেটদের রেখে খেতে পারলেন?ওরাও তো সেভাবে খাইনাই তিন দিন থেকে।

আমি বললাম,,,, ওরা খাইনাই বুঝলাম।তবে না খেয়েও থাকে নাই।খুদাই কষ্ট ও পাই নাই ওরা।

আর হ্যাঁ শুনো।আমি কিভাবে খেলাম?তার উত্তর হলো,

ওরা যেমন লাস্ট তিনদিন আমি রোমে থাকা সত্ত্বেও ক্ষেতে পেরেছে।আমিও সেভাবেই খেয়ে নিলাম আজকে।আশা করি উত্তর পেয়ে গেছো।আপু মেয়েটিকে একটা ধমক দিলো।আমি রুমে চলে আসলাম কাজ শেষ করে।

যদিও আমি ওদের থেকে সেরকম কিছুই আশা করিনা।

কারণ,যেখানে আমি ওদের হেল্প করতে পারি না।সেখানে আমি কিভাবে আশা করি ওদের থেকে হেল্প।সোজা হিসেব আমার।













Comments

Popular Posts